লালমোহনে বসতঘরে রহস্য ঘেরা আগুন, আতংকে একটি পরিবার!

প্রকাশিত: ১০:১৬ অপরাহ্ণ, মে ২৯, ২০১৯ | আপডেট: ১০:২৩:অপরাহ্ণ, মে ২৯, ২০১৯
লালমোহনে বসতঘরে রহস্য ঘেরা আগুন, আতংকে একটি পরিবার!

ভোলার লালমোহনে অন্নদা প্রসাদ গ্রামে একটি হিন্দু বাড়িতে রহস্যঘেরা আগুনের ঘটনায় ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে। আগুনের ঘটনার পর থেকে ওই পরিবারটি চরম আতংক আর উৎকন্ঠার মধ্যদিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। তবে কি কারনে আগুন লাগানো হয়েছে তা বলতে পারছে না কেউ। ঘটনার পর ৯দিন পেরিয়ে গেলেও পুলিশ কোন ক্লু বের করতে পারেনি। এতে পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

এদিকে আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ নিখিল চন্দ্রের বাড়ি পরিদর্শন করেছে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের নেতৃবৃন্দ।

মঙ্গলবার (২৮ মে) বিকালে জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গৌরাঙ্গ চন্দ্র দে’র নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে ঘটনার বিবরণ শুনেন তিনি। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জনিয়ে একই সাথে তিনি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের প্রতি সহানুভুতি জানিয়েছেন। অতি দ্রুত ঘটনার ক্লু উদঘাটনে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

এলাকাবাসী জানিয়েছে, লালমোহন উপজেলার আলোচিত লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের অন্নদাপ্রসাদ গ্রাম। ওই গ্রামেই ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তি সহিংসতায় বহু সংখ্যালঘু হিন্দু পরিবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এরপর থেকে বহু পরিবার এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এখনো সেই গ্রামে ২ হাজার হিন্দু পরিবার রয়েছে। তাদের মধ্যে নিখিল চন্দ্র দাসের বাড়ি একটি। সড়কের পাশে সবুজের ঘেরা জনবহুল পরিবেশে নিখিল চন্দ্রের বসত ঘর। সেখানে নিখিল চন্দ্র ও তার তিন ভাই বসবাস করেন।

সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে, নিখিল চন্দ্রের বাড়িতে নিরবতা আর আতংকের ছাপ। ঘরের ভেতরে আগুন লাগার চিহ্ন এখনো পড়ে রয়েছে। এখনো যেন ঘর পোড়া গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। ঘরের ঘাট, বিছানা, আলনা, আলমারি ও টিনের চালাসহ আসবাপত্র পুড়ে কয়লা হয়ে রয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার জানায়, গত সোমবার (২০ মে) মধ্যরাতে দুর্বৃত্তরা ঘুমন্ত অবস্থায় আগুন ধরিয়ে দেয় নিখিল চন্দ্রের ঘর। এতে নগদ ৫ লাখ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ প্রায় ২০ লাখ টাকার মালামাল পুড়ে যায়। এর ঘটনার পর থেকে চরমভাবে আতংকিত পরিবারটি। কে বা কারা এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা জানেনা কেউ।

ক্ষতিগ্রস্থদের পরিবারের ডাক-চিৎকারে এলাকাবাসী ছুটে এসে আগুন নেভাতে সক্ষম হয়। পুলিশ ও জনপ্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।

ক্ষতিগ্রস্থ নিখিল চন্দ্র দাস জানান, রাতে স্ত্রী, সন্তাসসহ পরিবারে সবাই ঘুমিয়ে ছিলো। মধ্যরাত দেড়টা থেকে ২টার মধ্যে ঘরের টিনের চালায় কারো উপস্থিতি টের পান তারা। এরপরেই আগুনের ঘটনা ঘটে। ডাক চিৎকার দিলে এলাকার মানুষজন ছুটে আসেন। কিন্তু তখই দুর্বৃত্তরা সটকে পড়ে।

নিখিল চন্দ্রের স্ত্রী অর্চনা রানী ও পুত্র বিশ্বজিৎ দাস জানায়, আমাদের সাথে কারো শত্রুতা নেই, কিন্তু তারপরেও কে বা কাহারা আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। আমরা কিছুই জানিনা। আমাদের সাথে কারো শত্রুতা নেই। আমাদের প্রানে মেরে ফেলার জন্য কি এমন ঘটনা হলো? আমরা আতংকিত অবস্থায় রয়েছি।

প্রতিবেশী মো: সৈয়দ জানায়, আমরা আগুন লাগার খবর পেয়ে ছুটে যাই, তবে কিভাবে আগুন লেগেছে তা জানিনা। নিখিল বাবুর সাথে কারো দ্বন্দ্ব নেই। তিনি কীটনাশকের ব্যবসার সাথে জড়িত রয়েছেন। তিনি জমির কেনা-বেচাও করেন। কারো সাথে বিরোধ রয়েছে কিনা জানিনা।

আরেক প্রতিবেশী জানান, এ ধরনের ঘটনায় আমরা হিন্দুরা আতংকিত। কোন সহিংসতা নাকি অন্যকিছু তা বলতে পারছি না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেল, নিখিল চন্দ্রের বাড়িতে ১৬-১৯ মে পর্যন্ত ৪দিন ব্যাপী নামযজ্ঞের অনুষ্ঠান হয়েছিলো। ভোরবেলা যজ্ঞ শেষ হয়। ওইদিন সেই রাতেই এ আগুনের ঘটনা ঘটে। পুরো এলাকায় থমথমে অবস্থা। যেন আতংক উৎকন্ঠা ছড়িয়ে পড়ছে। সংখ্যালঘু পরিবারগুলো চরমভাবে আতংকিত।

এদিকে রহস্যঘেরা আগুনের সুত্রপাত বা কিভাবে কারো ঘটিয়েছে ৯দিনেও সেটি উদ্ধার হয়নি। এতে নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। তবে অজানা কারনে কেউ কোন তথ্য জানাচ্ছে না।

জানতে চাইলে লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আবুল কাসেম জানান, নিখিল চন্দ্রের বাড়ির আগুন লাগার ঘটনা খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়েছি, সেও আমার কাছে একাধিকবার এসেছে, তিনি এলাকায় ভদ্র হিসাবে বিবেচিত, তার সাথে কারো দ্বন্দ্ব নেই। শুনেছি তিনি হুন্ডির ব্যবসা করেন। আমরা আগুন লাগার কারন খুঁজে বের করার চেষ্টার করছি।

ঘটনাস্থল পরিবদর্শন করে ভোলা জেলা পুজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক গৌরাঙ্গ চন্দ্র দে জানান, আগুন লাগার বিষয়টি সত্য। তবে কি কারনে আগুন দেয়া হয়েছে তা জানাতে পারেনি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার। আমরা ঘটনার তদন্ত পূর্বক দোষীদের খুঁজে বের করার দাবী জানাচ্ছি। একই সাথে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তার দাবী জানাচ্ছি।

লালমোহন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর খায়রুল কবির জানান, আগুন লাগার ঘটনায় লালমোহন থানায় একটি ডায়রি হয়েছে, ঘটনার পর থেকে পুলিশ একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। আমরা জোরালো তদন্ত করছি। এছাড়াও কিছু সেম্পল উদ্ধার করেছি, যা থেকে কোন ক্লু বের করার সম্ভব হতে পারে। আমাদের তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।