নববর্ষ ও আমাদের ঐতিহ্যের পহেলা বৈশাখ

সোহেব চৌধুরী সোহেব চৌধুরী

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২:০২ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০১৯ | আপডেট: ২:০২:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৪, ২০১৯
নববর্ষ ও আমাদের ঐতিহ্যের পহেলা বৈশাখ

অতিতের ভুল ত্রুটি ও ব্যর্থতার গ্লানি ভুলে নতুন করে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ।

আমরা সবাই কমবেশি নতুন এই দিনকে বরণ করে নিতে নিজেকে চাকচিক্য করে তুলি, পোষাকে সাজ বাড়িয়ে খাবারেও আনি মুখরোচক স্বাদের পরিবর্তন। এদিনটিতে সকল সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকে বলে পরিবারের সবাইকে আমরা একটু আধটু সময় দিয়ে থাকি, কেউ কেউ বেরিয়ে পড়ি নদীর পাড়ে বা বনে অবকাশ যাপনে।

চৈত্রের শেষ বৈশাখের শুরু এ সময়টাতে নদীর পাড়ে বা উপকূল সংলগ্ন এলাকাতে প্রচুর বাতাস থাকে তখন কার না মন চায় জীবনের সকল কর্ম ব্যাস্ততাকে ছুটি দিয়ে উড়ে যেতে ঐ দূর নীলিাকাশের উদাস মেঘকে একটু আলত করে ছুতে ?

কবে থেকে বাঙালীরা বাংলা এ নববর্ষের উৎসব পালন করে আসছে? মুগল সম্রাট আকবরের শাসনামল থেকেই হিজরি চন্দ্রাসন ও বাংলা সৌরসনকে ভিত্তি করে প্রবর্তিত বাংলা এ সনকে ব্যবসায়িক বা ফসলি সন হিসেবে পালন করা হলেও পরবর্তিতে এটি হালখাতা বা বকেয়া লেনদেনের এ আনুষ্ঠানিক উৎসবে রূপান্তরিত হয়।

এসময় চৈত্রের শেষ সময় পর্যন্ত বাংলার জমিদার ও তালুকদারদের জমির খাজনা পরিশোধ করত কৃষক বা বর্গাচাষিরা, ব্যবসায়িক লেনদেনও পরিশোধ করতেন খরিদদার এবং পাওনাদাররা। মিষ্টিমুখ করাতেন ভূস্বামী ও ব্যাবসায়ীরা।

এ উপলক্ষ্যে তৎকালিন যুগ থেকেই প্রচলন ঘটে এক উৎসবমূখর আনন্দের অনুষ্ঠান ও মিলনমেলার। পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে পহেলা বৈশাখ হয়ে ওঠে আনন্দময় ও উৎসবমূখি এবং বাংলা নববর্ষেও এক শুভদিন হিসেবে পালিত হতে থাকে।

অতিতকালের সাথে তালমিলিয়ে আমরাও নববর্ষের মূল উৎসব হালখাতার আয়োজন করে থাকি এটি একটি অর্থনৈতিক ব্যাপার। গ্রামে-গঞ্জে-নগর মহানগরে ব্যাবসায়িরা নববর্ষের প্রারম্ভে তাঁদের পুরানো হিসাবপত্র সম্পন্ন করে হিসেবের নতুন খাতা খুলে থাকেন। এবং নতুন ও পুরাতন খরিদ্দারদের মিষ্টিমুখ করান। সে সূত্র থেকেই নববষেও উৎসব বাংলার গ্রামিন জীবনের সঙ্গ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। আর তাই এটি গ্রামঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

এ নববর্ষকে ঘিরে আমাদের ঘরে ঘরে বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজন ও প্রতিবেশিদের আগমন ঘটে এবং মিষ্টি, পিটা, পায়েসসহ বিভিন্ন লোকজ খাবার তৈরিতে ধুম পরে যায়। একে অপরকে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করি যা এখন শহরাঞ্চলেও বহুল প্রচলিত। নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে গ্রামগঞ্জ ও শহরাঞ্চলের মাঠে ঘাটে এবং বটবৃক্ষের নিচে বসা বৈশাখী মেলা।

প্রতিবছরের ন্যায় আমাদের ভোলা জেলায়ও বৈশাখী মেলা বসে আমাদের চরফ্যসনের স্টেডিয়াম মাঠেও ঐতিহ্যবাহী মেলা বসে। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে বিশেষ করে আমি যখন মেলায় যাই তখন আমার শৈশবকে কিছু সময়ের জন্য হলেও ফিরে পাই আমার অনুভূতিতে। হেটে হেটে মেলার দোকান বা স্টলগুলো ঘুরে দেখি। ঘুরে দেখি বিভিন্ন লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব প্রকার হস্তল্পিজাত ও মৃৎশিল্পজাত পণ্যগুলোর দোকান।

এছাড়াও মেলায় আছে শিশু-কিশোরদের খেলনা, মহিলাদের সাজ-সজ্জা সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন চিড়া মুড়ি, খৈ, বাতাসা, বিভিন্ন প্রকারের পিঠা ও বৈচিত্র্যময় মিষ্টির সমারোহ। মেলায় আছে সাংস্কৃতিকজোটের সমহ্নয়ে বিনোদনের ব্যবস্থা।

দেশ থিয়েটার, সেতুবন্ধন খেলাঘর, শ্রাবণী খেলাঘর আসর ও মালঞ্চনাট্টমের ঐতিহ্যবাহি পালাগান, জারিসারি, ভাটিয়ালি গান, ভারত নাট্টম ও বিখ্যাত জয়পুরার নৃত্যের পাচালী।

সেই সাথে আছে মঞ্চ মাতানো নাটকের দল। শিশুকিশোরদের পুতুল নাচ ও নাগরদোলার আয়োজনও বাদ যায়না এ মেলার বিশেষ আয়োজন থেকে। বৈশাখের সকালে মঙ্গলশোভা যাত্রা দিয়ে শুরু হয় আমাদের আয়োজন সেই সাথে সাঝের বেলায় পাখিরাও নিড়ে ফিরে আসে, সেই সাথে আমাদের জন্যও মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসুক সৃষ্টিকর্তার কাছে এ কামনাই করি। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলকে জানাই ১৪২৬ বাংলা নববর্ষের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।

সোহেব চৌধুরী

লেখক ও সাংবাদিক