শিশুদের সাথে একদিন

প্রকাশিত: ৩:০৪ অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০১৯ | আপডেট: ৩:৩৩:অপরাহ্ণ, মার্চ ৩০, ২০১৯
শিশুদের সাথে একদিন

আজকের শিশুরাই একদিন গড়বে সমৃদ্ধ দেশ। শিশুরাই একদিন এদেশকে করবে সোনার বাংলাদেশ। তবে কেন শিশু শ্রম, শিশু পাচার আর শিশু নির্যাতনের মত বর্বরতা ছেয়ে যাচ্ছে চারদিকে?

আজকের শিশুরাই ভবিষ্যৎ এর অমূল্য সম্পদ। এদের শারীরিক, মানসিক, সাংস্কৃতিক সকল দিকের প্রতিভা বিকাশের উপর নির্ভর করছে দেশের অগ্রগতি।

স্নেহ ভালবাসা, পরিচর্যা, নিরাপত্তা, সঠিক দিকনির্দেশনা, সুস্থ্য পরিবেশ ও নিরাপদ আশ্রয় অবশ্যই জরুরী শিশুদের বেড়ে ওঠায়। কিন্তু বাবা-মা, ভাই-বোন ছাড়াও যত্ন আর সুন্দর ডিসিপ্লিনের মধ্যে কিভাবে একটু একটু করে বেড়ে উঠছে কিছু এতিম শিশু তা জানতে, আর শিশুদের কিছু ইচ্ছা অনিচ্ছার গল্প শুনতে আমরা চরফ্যাসন সরকারি কলেজের অনার্স ৪র্থ বর্ষের সমাজকর্ম বিভাগের একদল শিক্ষার্থী গিয়েছিলাম চরফ্যাসন এতিমখানায়।

তখন ২০১৭ সাল। জাতীয় শিক্ষানীতির আলোকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ৪র্থ বর্ষের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থীদের মাঠকর্ম প্রশিক্ষণ এর জন্য চরফ্যাসন সরকারি কলেজ থেকে মনোনীত প্রতিষ্ঠান ছিল চরফ্যাসন এতিমখানা।

পুঁথিগত বিদ্যাকে বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য মাঠকর্ম অত্যাবশক। সমাজকর্মের অর্জিত জ্ঞান তখনই পরিপূর্ণতা পায় যখন তা বাস্তব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়। আমাদের ৬০ কর্মদিবসের প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরছি। ১২জনের একটি দলে দলনেতার দায়িত্বে ছিলাম। সঠিক ভাবে পালন করতে চেষ্টা করেছিলাম আমার উপর অর্পিত দায়িত্ব।

গিয়েছিলাম চরফ্যাসন এতিমখানায়। চারপাশে ছোট ছোট শিশুদের কোলাহল। আমাদেরকে দেখে চারপাশ থেকে ছুটে আসলো ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা। মনটা আনন্দে ভরে উঠলো ওদের উৎফুল্লতা আর কৌতুহলী চাহনিতে এগিয়ে আসা দেখে। ওদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলার পর কথা বলেছিলাম এতিমখানাটির পরিচালক জনাব সিরাজুল ইসলাম স্যারের সাথে। জেনেছিলাম মোট কতজন শিশু বর্তমানে ভর্তি আছে প্রতিষ্ঠানটিতে। জেনেছিলাম প্রতিষ্ঠানে শিশুদের দৈনন্দিন কর্মসূচি। তাদের জন্য নিরাপদ খাবার, সঠিক পাঠদান, মুক্ত খেলার মাঠ, শরীরচর্চা, থাকার সুব্যবস্থা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ রয়েছে কিনা এ ব্যাপারে আলোচনা হয় ওনার সাথে।

এসব ব্যাপারে কোনো সমস্যার সম্মুখীন হতে হয় কিনা, সমস্যাগুলোর কারণ জানতে এবং এর সমাধান খুঁজে বের করতে তাদের সহযোগী হতে চেষ্টা করেছি। কথা বলেছিলাম শিশুদের সাথে। খুব কাছে থেকে বুঝতে চেষ্টা করেছি তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছা, ভাল লাগা-মন্দ লাগার ছোট ছোট অনুভূতিগুলো। চেষ্টা করেছি এতিম শিশু গুলোর সাথে বন্ধুত্ব তৈরি করে আমাদের সমাজকর্মের অর্জিত জ্ঞানকে প্রয়োগ করে তাদের সমস্যা গুলোর সমাধান দিতে।

১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭  তারিখ হতে শুরু হয়ে অনেক রোদ, বৃষ্টি বৈরী আবহাওয়াকেও উপেক্ষা করে চলছিল চরফ্যাসন সরকারি কলেজের অনার্স ৪র্থ বর্ষের সমাজকর্ম বিভাগের শিক্ষার্থীদের “মাঠকর্ম প্রশিক্ষণ ৬০ কর্মদিবস”। সমাজকর্মের অর্জিত জ্ঞান, পদ্ধতি, কৌশল প্রয়োগ করে শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সংস্থায় তত্ত্বাবধায়কের অধীনে থেকে মাঠকর্ম সম্পন্ন করে। শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট সংস্থা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করে, সংস্থার প্রকৃতি ও পটভূমি সম্পর্কে ধারনা অর্জন করে, সংস্থার সমস্যা গুলো চিহ্নিত করে তা সমাধানের পথ নির্দেশ করে।

চরফ্যাসন সরকারি কলেজ থেকে মাঠকর্মের জন্য মনোনীত প্রতিষ্ঠান “চরফ্যাসন এতিমখানাতে” শিক্ষানবিশ সমাজকর্মী হিসেবে আমি যে শুধু জ্ঞান প্রয়োগ করেছি তা নয়, জ্ঞান অর্জনও করেছি। প্রতিষ্ঠানের পরিচালক জনাব সিরাজুল ইসলাম স্যারের যথেষ্ট সহযোগিতা, আন্তরিকতা আমাদের কাজকে আরও সহজ করে দিয়েছে। চরফ্যাসন এতিমখানাতে মাঠকর্ম কার্য সম্পাদনকালে এখানের নিয়ম কানুন, নিবাসীদের থাকার পরিবেশ, পড়াশুনা, বিনোদন ব্যবস্থা গুলো আমার খুব ভাল লেগেছে। এই এতিমখানাটি অন্যান্য এতিমখানার মত নয়। অন্যান্য এতিমখানায় নিবাসীদের থাকা, খাওয়াসহ মাদ্রাসা থাকে। সেখানেই নিবাসীরা পড়ালেখা করে। কিন্তু চরফ্যাসন এতিমখানাটিতে নিবাসীদের থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থার পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুল কলেজে তাদেরকে পড়ালেখা করানো হয়।

একদিন খেলার ছলে শিশুদের কাছে জানতে চাইলাম পড়ালেখা করতে ওদের কেমন লাগে। কেউ কেউ ভাল লাগে জানালেও ৫ম শ্রেনীর সাখাওয়াত জানায়, পড়ালেখা করতে গিয়ে সকল বিষয় ভাল লাগলেও তার মাঝে রয়েছে কিছুটা অংক ভীতি। সে এটা নিয়ে প্রায় সময় চিন্তিত থাকে। অনেক সময় অংক বইটা ধরেও না। তবে এটাই সত্যি আমরা পড়ার সময় যে বিষয়টা কম পারি সেটাই ফেলে রাখি আর যেটা পারি সেটা বেশি বেশি পড়ি। যাইহোক, অংকের দূর্বলতা কাটিয়ে অংককে সহজ ভাবে নেওয়ার জন্য সাখাওয়াতকে বিভিন্ন কৌশল শেখাতে চেষ্টা করেছিলাম। পড়ার রুটিন তৈরি করে দিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে অংক ভীতি টা কমে আসতে লক্ষ্য করলাম।

এতিমখানাটির দৈনন্দিন কর্মসূচি পরিচালকের নির্দেশনা ও রুটিন অনুযায়ী হয়ে থাকে। এসব কাজ আরও সুন্দরভাবে সম্পাদন করার লক্ষ্যে আমরা এতিমখানার পরিচালক জনাব সিরাজুল ইসলাম স্যারের পরামর্শ ও তত্ত্বাবধানে ৮০জন ছেলে মেয়েদেরকে ৮টি দলে বিভক্ত করি। প্রত্যেক দলে ১০জন করে সদস্য নির্বাচন করি, একজন করে দলনেতা নির্বাচন করি। যাতে প্রত্যেকে তার দল নিয়ে সুন্দর ভাবে কাজ সম্পাদন করতে পারে।

এতিমখানায় থেকে শিশুরা আসলে শিক্ষাক্ষেত্রে কতটুকো এগুতে পারছে জানতে চাইলে এতিমখানাটির পরিচালক জানায় এই এতিম খানাটির আরও একটি উজ্জ্বল সফলতার কথা। জানলাম যে, চরফ্যাসন এতিমখানা থেকে বেড়ে ওঠা রফিকুল ইসলাম নামের এক ছাত্র বর্তমানে সরকারি মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। ২০০৫ সালে সে চরফ্যাসন এতিমখানায় ভর্তি হয়। এতিমখানায় থাকাকালীন রফিকুল উত্তর মাদ্রাজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে পঞ্চম শ্রেনীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায়, ২০১২ সালে চরফ্যাসন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেনীতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পায় এবং একই স্কুল থেকে এস.এস.সি তে জিপিএ-৫ এরপর ২০১৬ সালে চরফ্যাসন সরকারি কলেজ থেকে এইচ.এস.সি তে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়। এরপর ঢাকায় একটি মেডিকেল কোচিংয়ে ভর্তি হয়। তবে সে বছর মেডিকেলে চান্স না পেলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের “ঘ” ইউনিটে চান্স পায় সে। “ঘ” ইউনিটে ৮২৭ তম হয়ে নৃবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। এর পরের বছর দ্বিতীয়বারের মত মেডিকেলে পরীক্ষা দিয়ে ৩৪৪০ তম হয়ে রাঙামাটি মেডিকেলে ভর্তির জন্য সুপারিশকৃত হয়েছে। এতিমখানা থেকে প্রতি মাসে রফিকুল ইসলাম কে ৩০০০ টাকা দেওয়া হয়।

এতিমখানার পরিচালক বলেন- রফিকুল আমাদের সবার মুখ উজ্জ্বল করেছে। সে অনেক ভাল ছাত্র, আমরা সবসময় তার পাশে আছি। এতিমখানার সকল ছাত্রই আমার সন্তানের মত। তারা ভাল করলে বাবা মায়ের মতই আমাদের আনন্দ হয় বলে জানালেন তিনি। সরকারি ও নিজস্ব অর্থায়নে চরফ্যাসন এতিমখানাটির ৮০ জন ছাত্র বর্তমানে বিভিন্ন যায়গায় পড়ালেখা করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। সমাজকর্মী হিসেবে প্রয়োজনীয় কেস স্টাডি তৈরি করতে গিয়ে এতিমখানার নিবাসীদের কাছাকাছি থেকে তথ্য সংগ্রহ করে অনুভব করেছি এখানে আরও অনেক মেধাবী ছাত্র রয়েছে যারা চেষ্টা করলেই রফিকুলের মত উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারবে যদি তাদের চেষ্টা আর লক্ষ্য ঠিক থাকে। তাদের কিছু সমস্যাও আমরা সমাধান দিতে চেষ্টা করেছি। এতিমখানাটির বেশির ভাগ ছাত্র চরফ্যাসন টাউন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ালেখা করছে। আমরা গিয়েছিলাম সেখানেও। বিদ্যালয়টির শিক্ষকদের কাছে জানতে পারলাম বিদ্যালয়ে অন্যান্য ছাত্রদের তুলনায় এতিমখানার ছাত্র গুলো বেশি ভদ্র কারন তারা এতিমখানাতে ডিসিপ্লিনের মধ্যে থাকে, এরা অন্যদের তুলনায় লেখাপড়ায়ও বেশ আগ্রহী ও মেধাবী।

মাঠকর্ম প্রশিক্ষণের অনেক কাজই আমরা সফল ভাবে সম্পন্ন করেছি। আমরা দেখলাম যে ভালাবাসা, সঠিক দিকনির্দেশনা, পরিচর্যা, সুস্থ্য পরিবেশ ও নিরাপদ আশ্রয় একটি শিশুর ভবিষ্যৎ অগ্রগতির পাথেয়। শিশুশ্রম, শিশু পাচার, শিশু নির্যাতনের মত জঘন্য বর্বরতা থেকে মুক্তি পাক বাংলাদেশ। শিশুরা বেড়ে উঠুক নিরাপদে। আজকের শিশুরাই হবে আগামীদিনের দেশ পরিচালক।

সাদিয়া আক্তার মুনিয়া
এম.এস.এস (মাস্টার্স)
সমাজকর্ম বিভাগ
ভোলা সরকারি কলেজ।