পলান সরকারঃ আমাদের জ্যোতির্ময়ের চলে যাওয়া…

প্রকাশিত: ৮:৩৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০১৯ | আপডেট: ৮:৩৮:অপরাহ্ণ, মার্চ ২, ২০১৯
পলান সরকারঃ আমাদের জ্যোতির্ময়ের চলে যাওয়া…

পলান সরকার না ফেরার দেশে চলে গেছেন এ সংবাদ মিডিয়ার সুবাধে ইতোমধ্যে সবাই জেনে গেছে, আজ তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়েছে।

কাল তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে ব্যথিত হয়েছি। কারণ আমাদের আজ অনেক কিছু আছে! কিন্তু স্বল্প শিক্ষিত, সাদা মনের, গাও-গেরামের বইয়ের ফেরিওয়ালা/জ্ঞানের ফেরিওয়ালাদের সংখ্যা খুবই নগন্যবটে।

পিতৃহারা পলান সরকারকে ৫ম শ্রেণী পাস করার পর শিক্ষা জীবনের ইতিটানতে হয়। পৈতৃক চালের কল আর ধানী জমি সম্বল করে সংসারের ঘানি শুরু করা।

কিন্তু ভেতরে ভেতরে জ্ঞান পিপাসু এই মানুষটির অন্তর আত্মা বোধহয় জ্বলতে থাকে জ্ঞান অন্বেষণের জন্য।রাজশাহীর তাঁর জন্মস্থান গ্রামে তাঁর উদ্যোগে কষ্টার্জিত আয় থেকে বই কেনে নিজে পড়েন আর পাড়ায় পাড়ায় বই পড়ানোর অভ্যাস তৈরী করার কাজে নেমে পরেন।

প্রথম প্রথম অনেকেই বই ফেরত দিতেন না। এনিয়ে অভিযোগ ছিলো তার মেয়ে রোকেয়া খাতুনের। কিন্তু তাঁর কি সরল উক্তি, ‘বইতো তাদের কাছেই আছে, পড়ার জন্যইতো রেখেছে।’

মেয়ে রোকেয়া খাতুনের কথা থেকে জানা যায়-তাঁর বড় ছেলের বারণ সত্বেও মেয়েকে শহরের কলেজে পড়িয়েছেন, নামী-দামী পাত্র পাওয়া পরও মেয়কে এমএ পাস না করিয়ে বিয়ে দেবেন না। আহারে আমাদের মতো উচ্চ ডিগ্রীধারী, বেশ ভূষণ ওয়ালারা যখন উচ্চপদস্থ চাকুরীজীবি, টাকার ব্যবসায়ী অথবা বৈদেশ ফেরত পাত্র হলে বাল্য বিবাহ দিতে জন্ম সনদও জাল করতে পারি।

শ্রদ্ধাষ্পদ পলান সরকার বেগম রোকেয়া বেঁচে থাকলে তিনিও বোধকরি আজ আপনার জন্য ব্যথিত হতেন, পায়রা বন্দে স্মরণ করতো।

প্রায় শত বছর বেঁচে ছিলেন, তিনি বই পাঠকের কাছে পৌছে দেবার মধ্যেদিয়ে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর কাজটি বন্ধ করেন নি। বার্ধক্য তাঁকে রোধতে পারেনি।

কি আশ্চর্য পলান সরকার আপনার নামের আগে পরে সাবেক কিংবা বর্তমান কোনো পদ পদবী নেই। এখানেই ৬৮ হাজার গ্রামের সাধারন মানুষের গৌরব আপনি’ আমাদের পলান সরকার’ হিসেবেই আছেন।

মিডিয়ার কল্যাণে আমাদের গেরামের সাধারন জ্ঞানের আলোর ফেরিওয়ালার খবরটি ঢাকার সম্ভ্রান্ত সুধী জনের কানে পৌছে গেছে আর বঙ্গবন্ধু কন্যা যিনিও গেরামের কাঁদামাটিতে বড় হয়ে আজকের মানবিক রাষ্ট্র নায়ক তিনি এখবরে আন্দোলিত হয়ে ২০১১ সালে রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ সম্মান সমাজ সেবায় একুশে পদক প্রদান করেন। আমরা গ্রামবাসী কৃতজ্ঞ আমাদের রাষ্ট্রের কাছে।

একেবারেই নির্মোহ পলান সরকার খ্যাতি যশ চাননি। তার উচ্চ শিক্ষিতা মেয়ে রোকেয়া খাতুন বাবার নামে রাজশাহীতে একদল বই প্রেমীরা ‘ পলান সরকার পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করায় বেশ খুশি। আমারও অতল শ্রদ্ধা পাঠাগারের উদ্যোক্তাদের গৈ- গেরামের আলোকিত পলান সরকারকে পাঠকের মাঝে বাঁচিয়ে রাখার জন্য।

‘পলান সরকার’ আপনি নেই। মৃত্যু হয়েছে আপনার। স্বজনরা আহাজারির মধ্যেও দাফন করেছে। কিন্তু রাত্রি বেলা আপনি চোখ খুলে অন্ধকার গোরস্থানেও শুয়ে শুয়ে দেখবেন ‘ পলান সরকার পাঠাগার’, সরকার প্রধানের দেয়া রাষ্ট্রের সর্ব্বোচ্চ পদক, পাঠকের ঘরে ঘরে ইচ্ছে করে ফেরত না দেওয়া বইগুলো কেমন আলো ছড়াচ্ছে।

আপনি যে আলোর মশাল ছড়িয়ে দিলেন নিজ গ্রামে সে আলো ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে সবখানে।

বিনম্র শ্রদ্ধা হে আমাদের জ্ঞানের আলোর ফেরিওয়ালা।

কৃতজ্ঞতাঃ প্রথম আলো