নূর হোসেনের আত্মাহুতি ও গণতন্ত্রের বর্তমান হাল

প্রকাশিত: ১২:২৭ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৭ | আপডেট: ১২:২৯:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ১১, ২০১৭
নূর হোসেনের আত্মাহুতি ও গণতন্ত্রের বর্তমান হাল

সময় বহতা নদীর মতো। অনাদিকাল থেকে চলছে।

কত ঘটনা, কত ইতিহাস, কত সুখ আর দুঃখ গাথা সৃষ্টি করে সময় বয়ে চলছে আপন গতিতে, তার ইয়ত্তা নেই। কিছু ঘটনা মুছে যায় আর কিছু থেকে যায় মনের গহিনে। আজ থেকে ৩০ বছর আগে নূর হোসেন রাজপথে জীবন বিলিয়ে দিয়েছিলেন। স্বৈরাচারী সরকারের হাত থেকে গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য তাঁর সেই জীবন উৎসর্গ করা বাঙালির জাতির ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা, যা কখনোই ভোলার নয়। নূর হোসেন নিজের তাজা রক্ত বিলিয়ে দিয়ে এ দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার সংগ্রামকে বেগবান করেছিলেন। তাঁর আত্মদান বাঙালিকে স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে শক্তি জুগিয়েছিল, অনুপ্রেরণা দিয়েছিল; যার ফলে স্বৈরাচারের পতন ঘটে আর বাংলাদেশে পুনরুদ্ধার হয় গণতন্ত্র। নূর হোসেনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাঙালি খুঁজে পায় প্রতিবাদের ভাষা। যখনই ষড়যন্ত্রী কুচক্রীরা এ দেশের গণতন্ত্র নস্যাৎ করার চেষ্টা করে তখনই নূর হোসেনের আত্মত্যাগী চেতনায় উজ্জীবিত বাঙালি প্রবল বেগে রুখে দাঁড়ায় সেসব অপশক্তিকে। তাই ৩০ বছর আগে নূর হোসেন এই ধরাধাম থেকে বিদায় নিলেও অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে, গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে তাঁর আত্মত্যাগ সর্বদাই অনুপ্রেরণা জুগিয়ে চলছে আমাদের, চলবে অনাগত আগামী দিনে।

দেশে দেশে মানুষ প্রতিনিয়ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করে চলছে। কারণ শুধু গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায়ই রয়েছে রাষ্ট্র পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের সরাসরি সুযোগ এবং জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের কাছে জবাবদিহির বাধ্যবাধকতা। এ জন্য আব্র্রাহাম লিংকন বলেছেন, গণতন্ত্র হলো জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের শাসন। অর্থাৎ জনগণকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় গণতন্ত্র। আমাদের দেশে গণতন্ত্র এসেছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগের হাত ধরে। কিন্তু দুর্ভাগ্য পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়ে বাংলার আকাশে দুর্ভেদ্য অন্ধকার নেমে এসেছিল। প্রলয়মেঘে ঢেকে গিয়েছিল পুরো বাংলাদেশ। ষাঁড়াষাঁড়ির বানের মতো অপ্রতিরোধ্য গতিতে অন্যায়-অবিচার, দুর্নীতি, দমন-নিপীড়নে বাঙালি হয়ে পড়ে দিশাহারা, বীতশ্রদ্ধ। সবচেয়ে বড় কথা, দেশ স্বাধীন হয়েছিল যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চেতনাকে ধারণ করে, সেই চেতনায় করাঘাত করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে প্রণীত সংবিধানের প্রস্তাবনার তৃতীয় অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হবে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে এমন একটি শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে সব নাগরিকের জন্য আইনের শাসন, মৌলিক মানবাধিকার এবং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে। ’ কিন্তু জিয়াউর রহমান এবং তাঁর পরবর্তী সময়ে এরশাদ সরকার দেশে সামরিকতন্ত্র কায়েম করে গণতন্ত্রকে ভূলুণ্ঠিত করেছিল। কিন্তু বাঙালির মানসে বিরাজমান প্রতিবাদী চেতনা স্বৈরতন্ত্রকে মেনে নিতে পারেনি। ১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর বাঙালি জাতি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে রাজপথে নেমে এসেছিল। গগনবিদারী প্রতিবাদী স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয়ে গিয়েছিল বাংলার আকাশ-বাতাস। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। যুবলীগকর্মী নূর হোসেন এমনই একজন।

স্বৈরাচারী সরকার প্রতিবাদী জনতাকে দমন করতে ঢাকার রাস্তায় নামিয়ে দিয়েছিল সামরিক-আধাসামরিক বাহিনী। কিন্তু সেই বাহিনীর মারণাস্ত্রকে পরোয়া না করে হাজারো প্রতিবাদী মানুষের সঙ্গে জীবন্ত পোস্টার হয়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন নূর হোসেন, ২৬ বছরের প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর এক যুবক। দেশমাতৃকার দুর্দিনে আওয়ামী লীগের কর্মী হয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে মিছিল-মিটিংয়ে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি। ওই দিনের অবরোধ কর্মসূচিতেও তিনি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের এক অভিনব পথ বেছে নেন। গায়ের জামা খুলে উদোম বুকে ও পিঠে সাদা রঙে লিখিয়ে নেন কিংবদন্তির সেই স্লোগান, ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক/গণতন্ত্র মুক্তি পাক। ’ জীবন্ত এক প্রতিবাদী পোস্টার, যে পোস্টার পৃথিবীর সব প্রতিবাদী পোস্টারকে হার মানায়। মুখের প্রতিবাদী স্লোগানের চেয়েও নূর হোসেনের শরীরে আঁকা ওই ছয় শব্দের কিংবা বলা চলে ১৭ অক্ষরের লেখাটুকু স্বৈরাচারী সরকারের পোষা বাহিনীর বুকে শেল হয়ে বিঁধেছিল শতগুণ বেগে। এমন জীবন্ত প্রতিবাদী পোস্টারকে সহ্য করা কঠিনই বৈকি। মিছিলটি জিরো পয়েন্টে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশে গুলিবর্ষণ শুরু করেছিল পোষ্যবাহিনী। গুলি এসে লেগেছিল নূর হোসেনের বুকে।

গুলির আঘাতে নূর হোসেনের দেহ থেকে প্রবাহিত রক্ত সেই ছয় শব্দ কিংবা ১৭ অক্ষরের প্রতিবাদী সাদা রঙের লেখাকে রক্তলালে রঞ্জিত করে তোলে। পতাকার মাঝের টুকটুকে লাল যেমন স্বাধীনতার জানান দেয়, ঠিক তেমনি নূর হোসেনের বুকের সেই রক্তলাল লেখা জানান দিয়েছিল গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের। মরণযন্ত্রণায় কাতর নূর হোসেনকে রিকশায় করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে পুলিশ টেনে-হিঁচড়ে রিকশা থেকে নামিয়ে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়। সেখানেই মৃত্যু হলো একটি তাজা প্রাণের, খসে পড়ল একটি নক্ষত্র। কবি শামসুর রাহমান তাঁর ‘বুক তার বাংলাদেশের হৃদয়’ কবিতায় বলেন, ‘ঝাঁক ঝাঁক বন্দুকের সিসা, নূর হোসেনের বুক নয়, বাংলাদেশের হৃদয় ফুটো করে দেয়; বাংলাদেশ বনপোড়া হরিণীর মতো আর্তনাদ করে, তাঁর বুক থেকে অবিরল রক্ত ঝরতে থাকে। ’ নূর হোসেন মৃত্যুঞ্জয়ী, তাঁর চেতনা অবিনশ্বর। গণতন্ত্রের মূলমন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে, গণতন্ত্রকে সমুন্নত রাখতে অনুপ্রেরণা হয়ে আমাদের মাঝে নূর হোসেন আছেন সর্বদা দেদীপ্যমান, চিরজাগরূক। তিনি আগামী প্রজন্মের কাছে টিকে থাকবেন দেশপ্রেম, সাহস, সংগ্রাম ও সংকল্পের প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত ও অনুপ্রেরণা হয়ে।

লেখক : প্রকাশক, চরফ্যাসন নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটনেট